ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে স্মরণের দিন
সুমন ঘোষ যশোর
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, রাজনীতি ও সমাজসংস্কারে রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান
আজ ৫ নভেম্বর। উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট নেতা, প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭০ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, জনসেবা ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্তের কারণে ইতিহাসে তিনি ‘দেশবন্ধু’ নামে পরিচিত।
চিত্তরঞ্জন দাশের পারিবারিক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর অঞ্চলে। তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন ঢাকা জেলার তেলিরবাগ গ্রামে। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
শিক্ষাজীবন শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান তিনি। মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে ১৮৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে আইন পেশায় যুক্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে একজন দক্ষ ও পরিচিত আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলায় বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই মামলায় আইনি যুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কৌশল নিয়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য দেখা দিলে তিনি আইনসভায় প্রবেশ করে ঔপনিবেশিক সরকারের বিরোধিতা করার পক্ষে অবস্থান নেন।
এই রাজনৈতিক চিন্তার ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে মতিলাল নেহরুর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন স্বরাজ পার্টি। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার ভেতরে থেকেই আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারের নীতির বিরোধিতা এবং স্বরাজের দাবি জোরালো করাই ছিল দলটির অন্যতম লক্ষ্য।
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার, নারীশিক্ষা, সামাজিক সংস্কার ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত সম্পদ ও উপার্জন জনকল্যাণে ব্যয় করে তিনি মানুষের মধ্যে বিশেষ শ্রদ্ধার স্থান অর্জন করেন। জনসেবায় আত্মনিয়োগের স্বীকৃতিস্বরূপই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘দেশবন্ধু’ উপাধি।
চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৪ সালে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে স্বাধীনতা কেবল শাসন পরিবর্তনের বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। তাঁর মৃত্যুতে উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জীবন উপমহাদেশের ইতিহাসে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..