শিরোনাম: বক্তব্য বদল, কল রেকর্ড ও মামলার অসঙ্গতি—যশোরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলায় ‘ফাঁসানোর অভিযোগ’ জোরালো
যশোরে আলোচিত একটি ধ'র্ষ'ণ মামলাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠছে। মামলার কাগজপত্র, ঘটনাপ্রবাহ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে—যা সাংবাদিকদের ফাঁসানোর অভিযোগকে আরও জোরালো করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সামিয়া আফরুজ প্রথমে মনিরামপুরে ধ'র্ষ'ণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে যশোরে একাধিক সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে এর মধ্যেই সাংবাদিক আসিফ আকবর সেতুর কাছে তিনি একাধিকবার যোগাযোগ করে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এ সংক্রান্ত কল রেকর্ডও সংরক্ষিত রয়েছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, ‘জিহাদ’ নামে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত রাফসান জানির পক্ষে সাংবাদিক সেতুর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বড় অংকের অর্থের প্রস্তাব দেন। তবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে জানা গেছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সংবাদ সম্মেলন এবং পরবর্তীতে মামলা দায়েরের ঘটনাকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোরের কোতয়ালী আমলী আদালতে দায়ের করা মামলায় বাদী ডা. মোঃ রাফসান জানি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৮৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাংবাদিক পরিচয়ে একটি চক্র তার কাছ থেকে বিভিন্ন সময় বিপুল অংকের অর্থ দাবি করে এবং না দিলে ধ'র্ষ'ণ মামলা ও চাকরিচ্যুতির ভয় দেখায়।
তবে ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি সামনে এসেছে। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, সাংবাদিক আসিফ আকবর সেতুর এক সহযোগী ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে দায়ের করা মামলায় সরাসরি সেতুর বিরুদ্ধেই ৩০ হাজার টাকা চাওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের এই পরিবর্তন ও অসামঞ্জস্য পুরো ঘটনাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে, কারণ পূর্বের বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী মামলার বয়ানে স্পষ্ট অমিল রয়েছে।
এছাড়া মামলার বিবরণ বিশ্লেষণে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
প্রথমত, মামলায় উল্লেখ করা সময়সীমা (৮ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ) জুড়ে একাধিকবার হুমকি ও অর্থ দাবির কথা বলা হলেও, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরে বিলম্বে মামলা দায়ের করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ঘটনাটিকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে রাফসান জানি তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী শালীকে ‘মানসিক রোগী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সামিয়া আফরোজ দাবি করেন, তাকে দিয়ে এসব ‘নাটক’ করানো হয়েছে। একই বিষয়ে মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ভুক্তভোগী নিজেই থানায় এসে মামলা করেছেন এবং তাকে আটকে রাখার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে একই ঘটনায় তিনটি ভিন্নধর্মী বক্তব্য পুরো বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
এছাড়া এ ঘটনার পর থেকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অভিযোগ, মামলার বাদী ডা. রাফসান জানি বিভিন্ন মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছেন, যা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তৃতীয়ত, অর্থ দাবির অংকে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে—কখনও ৩০ হাজার, আবার কখনও ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অভিযোগের ধারাবাহিকতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।
চতুর্থত, সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভুক্তভোগী নিজেই থানায় গিয়ে মামলা করেন এবং পরে বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে আসে—যা সাংবাদিকদের স্বাভাবিক পেশাগত কাজের মধ্যেই পড়ে।
পঞ্চমত, মামলায় শ্যালিকাকে থানায় আটকে রেখে জোরপূর্বক মামলা করানোর অভিযোগ থাকলেও, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন প্রমাণ বা প্রশাসনিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা একটি সংবেদনশীল অভিযোগের তথ্য যাচাই ও প্রকাশ করেছেন মাত্র। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন দিকে মোড় নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাদের মতে, সহায়তা চাওয়ার কল রেকর্ড, অর্থ প্রস্তাব, বক্তব্যের পরিবর্তন এবং অভিযোগের অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে এই মামলাটি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, কল রেকর্ডসহ প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব।
ঘটনাটি এখন একটি মামলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, আইনের প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জটিল ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই এ বিতর্কের সমাধানের একমাত্র পথ।
এ জাতীয় আরো খবর..