‘কঙ্কাল আর খুলি ছড়িয়ে আছে’ — রোহিঙ্গা গ্রামে আরাকান আর্মির যুদ্ধাপরাধ
মীর দিনার হোসেন: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) হাতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো নৃশংস গণহত্যার দুই বছর পরও বেঁচে যাওয়া লোকজন নিজ গ্রামে ফিরতে পারছেন না। অনেকে কার্যত আটক অবস্থায় রয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) আজ ১৯ মে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
‘স্কেলিটনস অ্যান্ড স্কালস স্ক্যাটার্ড এভরিহোয়্যার: আরাকান আর্মি ম্যাসাকার অব রোহিঙ্গা মুসলিমস ইন হোয়্যার সিরি, মিয়ানমার’ শীর্ষক ৫৬ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ২ মে বুথিডং টাউনশিপের হোয়্যার সিরি (বর্মী নাম: হতান শাউক খান) গ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। আরাকান আর্মি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুটি ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় নিরস্ত্র রোহিঙ্গা গ্রামবাসীদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালায়। এই ঘটনায় আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে যা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ইমেজ, ছবি ও ভিডিওর ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সাক্ষ্য অনুসারে, গ্রামবাসীরা সাদা পতাকা উড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হলে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা তাদের ওপর গুলি চালায়।
একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বলেন, “প্রথমে আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়, তারপর আমার স্ত্রী ও শিশু কন্যা।” আরেক নারী জানান, মসজিদের পাশের ধানক্ষেতে জড়ো করা গ্রামবাসীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। আহতদের কাছে এসে কাছ থেকে আবার গুলি করা হয়।
এইচআরডব্লিউ ১৭০ জনেরও বেশি গ্রামবাসীর তালিকা তৈরি করেছে যারা নিহত বা নিখোঁজ। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ জন শিশু। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্রামের তিনটি স্থানে মানুষের হাড়-কঙ্কাল ও খুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার ছবি ও ভিডিও যাচাই করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, আরাকান আর্মি পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। যোদ্ধারা গ্রামবাসীদের টাকা-গয়না লুট করেছে, নারী ও কিশোরীদের অপহরণ করেছে। আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, এমনকি বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরাকান আর্মি বেঁচে যাওয়াদেরকে কাছাকাছি একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। সেখানে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা নেই, জোরপূর্বক শ্রমে ব্যবহার করা হয় এবং খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব চরমে। আগস্টে সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত সফরের সময় বেঁচে যাওয়াদেরকে জোর করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দশকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়।
এইচআরডব্লিউ উভয় পক্ষকে অসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি স্বাধীন তদন্তের জন্য উভয় পক্ষকে সহযোগিতা করারও দাবি করেছে।
এ জাতীয় আরো খবর..